সুদখােরের বাহ্যিক স্বচ্ছলতা একটি ধোঁকা

0
186

মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ.
সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি, পাকিস্তান

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে , আজকাল তাে সুদখােরদের খুব সুখে-শান্তিতে থাকতে দেখা যায়। তারা বিশাল ভবন আর অট্টালিকার মালিক। আরাম-আয়েশের সব উপকরণ সেখানে প্রস্তুত। পানাহার আর বসবাসের সীমাহীন বিলাসী সামগ্রী তাদের। চাকর-নকর ও নিরাপত্তাকর্মী হুকুমের অপেক্ষায় সদা তৈরি থাকে। জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করে।

চিন্তা করে দেখুন, শান্তি-নিরাপত্তার উপকরণ আর ‘শান্তি-নিরাপত্তা’-এর মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক। শান্তির উপকরণ তাে ফ্যাক্টরি আর কারখানায় তৈরি হয় এবং বাজারে বিক্রি হয়। টাকা-পয়সার বিনিময়ে এগুলাে কিনে মালিক হওয়া যায়। কিন্তু শান্তি যাকে বলে তা কোনো মিলকারখানায় তৈরি হয় না। না কোনো বাজারে কিনতে পাওয়া যায়।

শান্তি এমন এক অনুভূতি, এমন এক রহমত যা সরাসরি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে দান করা হয়। যা কখনও অসহায়-দরিদ্র এমনকি জন্তুজানােয়ারকেও দিয়ে দেয়া হয়। আবার কখনও বিশাল সম্পদশালী  ব্যক্তিকেও দেয়া হয় না।

একটি শান্তিকে নিয়েই চিন্তা করুন। তা হচ্ছে ঘুমের শান্তি । এটা পাওয়ার জন্য আপনি এটা করতে পারেন, শােয়ার জন্য একটা ভালো বাড়ি বানালেন। তাতে আলাে-বাতাসের যথােপযুক্ত ব্যবস্থা করলেন। দৃষ্টিনন্দন আর চিত্তাকর্ষক ফার্নিচার দিয়ে বাড়িকে সুন্দর করে সাজালেন। শাহী খাট আর নরম নরম বিছানা বালিশের ব্যবস্থা করলেন। এসবের প্রভাবে কি আপনার ঘুম এসে যাবে?

যদিও আপনার এ সমস্যা নেই তবু খবর নিয়ে দেখুন, হাজার হাজার মানুষ এমন আছে যারা বলবে, না, এতে ঘুম আসবে না। যাদের কোনো না কোনো সমস্যা এমন আছে, এসব উপকরণ থাকা সত্ত্বেও তাদের ঘুম হয় না। বিলাসী এসব সামগ্রী উজাড় পড়ে থাকে। কিন্তু ঘুম নেই। ঘুমের ট্যাবলেটও অনেক সময় অপারগতা জানিয়ে দেয়।

ঘুমানাের আসবাবপত্র তাে আপনি বাজার থেকে কিনে নিয়ে আসলেন। কিন্তু ঘুম তাে কোন বাজার থেকে বিরাট অংকের টাকায়ও কিনে আনতে পারেন না। অন্যান্য শান্তি ও স্বাদের ব্যাপারও একই রকম। সে সবের উপকরণ তাে টাকা-পয়সার মাধ্যমে অর্জন করতে পারেন, কিন্তু শান্তি ও স্বাদ তা থেকে অর্জিত হওয়া জরুরি নয়। উপকরণ থাকার পরও শান্তি ও স্বাদ নাও পাওয়া যেতে পারে।

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ সফলতার সোনার কাঠি

এখন সুদখােরদের অবস্থা নিরীক্ষণ করুন। দেখবেন, তাদের কাছে সব কিছু আছে। কিন্তু একটা জিনিসই তাদের কাছে পাবেন না। তাহলাে শান্তি । তারা এক লাখকে দেড় লাখ, দেড় লাখকে দুই লাখ, দুই লাখকে আড়াই লাখ বানানাের মােহে পাগলের মতাে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেন একজন মােহগ্রস্ত অস্থির মানুষ।

পানাহারের কোন চিন্তা নেই। পরিবার-পরিজনের কোন খবর নেই। কয়েকটি মিল-কারখানা চলছে। অন্য দেশ থেকে জাহাজ আসছে। এসবের দেখাশোনা করতেই সকাল রাত হয়ে যায়, আর রাত সকাল হয়ে যায়। কোথায় খাবার? কোথায় ঘুম? অস্থির এক শাস্তির জীবন।

আফসােস, এ পাগলেরা শান্তির উপকরণকেই শান্তি বুঝে বসে আছে। আসলে এরা শান্তি থেকে অনেক দূরে। যদি এসব মিসকিনেরা শান্তির ব্যাপারে একটু চিন্তা করতাে তাহলে নিজেকে সবচেয়ে বড় অসহায়, সবচেয়ে বড় দরিদ্র অনুভব করতাে। হযরত আযীযুল হাসান মাজযুব রহ. কি চমৎকার ভাষায় বলেছেন

تونالیے جے کجاوہ مکمل ہو جائے

তুমি যাকে ভেবেছ লায়লী
জানি তুমি ব্যর্থ প্রয়াসী!

এ হলাে তাদের সুখ-শান্তির অবস্থা। এরপর তাদের সম্মানের অবস্থা দেখা। যাক। এ ধরনের কঠিন অন্তরের লােকেরা দরিদ্র ও অসহায়দের দরিদ্রতা ও অসহায়ত্ব থেকে স্বার্থ হাসিল করে। তাদের রক্ত চুষে নিজেদের শরীর পালে। এজন্য লােকদের অন্তরে তাদের প্রতি কোনো সম্মানবােধ থাকে না।

আমাদের দেশের ব্যবসায়ী এবং ইউরােপ আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের ইহুদীদের ইতিহাস পড়লে দেখা যাবে, তারা বিশাল বিশাল সম্পদের মালিক হওয়ার পরও দুনিয়ার মানুষের কাছে তাদের কোনো ইজ্জত-সম্মান ছিল না। বরং সাধারণ মানুষকে শােষণ করার কারণে তাদের প্রতি মানুষের  মনে হিংসা ও ঘৃণা জন্ম নিয়েছিল।

আজ দুনিয়াতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ার কারণ এটাই। দেশে দেশে যে যুদ্ধ চলছে তা এই হিংসা ও ঘৃণার ফলশ্রুতি। পুঁজিপতি আর শ্রমিকের লড়াই সমাজতান্ত্রিক মতবাদের জন্ম দেয়। তারপর আবার সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও সামাজিক হিংসার এ আগুন নেভাতে পারেনি। সেখানেও তৈরি হয়েছে বৈষম্য।

আবার জেগে ওঠে হিংসা। শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ। যে যুদ্ধের ডামাডােল দুনিয়াকে জাহান্নাম বানিয়ে ছাড়ে। এটাই হলাে পুঁজিপতিদের শান্তি এবং সম্মান। অভিজ্ঞতার আলােকে বলছি, সুদখােরদের সম্পদ তা ভবিষ্যত প্রজন্মকেও কলুষিত করে। তাদের জীবন থেকেও শান্তি কেড়ে নেয়। সম্পদের মূল উদ্দেশ্য অর্জনে তারা ব্যর্থ হয়। অপমানজনক জীবনযাপন করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here