যুবকদের প্রতি ইমাম হাসান আল বান্না (রহ) এর উপদেশ

0
76

ইমাম হাসান আল-বান্নার ব্যাপারে বলতে গিয়ে শাইখ আবদুর রাহীম ম্যাককার্থি বলেন ,
আমরা শাইখ আল-আলবানীর কাছে ইমাম হাসান আল-বান্নার বলা একটি কথা শিখেছিলাম –
“আপনাদের অন্তরের জগতে ইসলামের শাসনকে প্রতিষ্ঠা করুন, তাহলে আল্লাহ সারা পৃথিবীতে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন।”
.
শৈশবে ইমাম হাসান আল-বান্না ফযরের আযানের অনেক আগে মাসজিদে যাওয়ার প্রাক্কালে তাঁর মা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন ,
” এখনো ফযরের আযান হয়নি , তুমি এত আগে তাড়াতাড়ি কেন মাসজিদে যাচ্ছো?” উত্তরে ইমাম হাসান আল-বান্না বলেন,
“মুয়াজ্জিনের কাজ হচ্ছে মানুষকে জাগানো আর আমার কাজ হচ্ছে মুয়াজ্জিনকে জাগানো”।
.
তারাবিহ নামাজে রাকাত সংখ্যা নিয়ে তৎকালীন মিসরের একটি গ্রামে এশার নামাযের পর মুসল্লীদের মধ্যে আলোচনা চলছিলো । এই আলোচনা ঝগড়া ফাসাদে রূপ নেয়ার আশঙ্কা ছিলো । সেখানে তখন উপস্থিত হন ইমাম হাসান আল-বান্না । তিনি উপস্থিত মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য প্রদানের এক পর্যায়ে বলেন,
“হে আমার ভাইয়েরা! আপনারা যদি ঐক্য চান তাহলে আপনাদের ত্যাগ ও কোরবানী করতে হবে।দ্বীনের মৌলিক বিষয় ও সর্বসম্মত বিষয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করে যাবেন। আপনাদের শত্রু ইংরেজ অথবা ইহুদীরা আপনাদের বুকে গুলি চালানোর সময় পার্থক্য করবে না যে, কে শাফেয়ী আর কে হানাফী, কে আট রাকাত তারাবিহ পড়ে আর কে বিশ রাকাত তারাবিহ পড়ে। তাদের দৃষ্টিতে কালেমা পাঠ করা সব মুসলমানই শত্রু। তাদের সাফল্য এটাই যে, তারা আপনাদেরকে পরস্পরের সাথে ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত রাখতে পেরেছে। এ জন্য আজ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, শাখা প্রশাখার ঝগড়া পরিহার করে কুফরী ও জালেম শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে যাওয়া এবং নিজদেরকে খাঁটি মুসলমান বানানো।”
সুবহান আল্লাহ , মিসরের ইখওয়ানুল মুসলিমিনের(বর্তমান মুসলিম ব্রাদারহুড) প্রতিষ্ঠাতা ইমাম হাসান আল বান্নার দূরদর্শিতা এমনি বিচক্ষণ সম্পন্ন ছিলো , যিনি মাত্র ২২ বছর বয়সে ৬ জন সদস্য নিয়ে ১৯২৮ সালে উস্তাদ শহীদ (ইনশাআল্লাহ) সাইয়েদ কুতুবের(রাহিমাহুল্লাহ) দল “ইখওয়ানুল মুসলিমিন” প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । এরপর মাত্র ৪৩ বছর বয়সে ১৯৪৯ সালে তৎকালীন সেকুলার শাসকশ্রেণীর লেলিয়ে দেওয়া আততায়ীর গুলিতে তিনি(রহঃ) শহীদ হন ।
.
# যুবকদের প্রতি শহীদ ইমাম হাসান আল বান্নার ২০ টি উপদেশ:
১. তোমরা যে অবস্থায় থাক না কেন আযান শোনার সাথে সাথে নামাযের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করবে।
২. কোরআনকে পাঠ কর এবং এটা নিয়ে গবেষণা কর। যত কম সময়ই হোক না কেন সেটাকে আজেবাজে কাজে ব্যয় কর না।
৩. সবসময় স্পষ্টবাদী হওয়ার চেষ্টা কর কেননা এর দ্বারায় প্রমান হবে তুমি মুসলিম। আরবি শেখার চেষ্টা কর কেননা কেবলমাত্র আরবি ভাষার মাধ্যমেই কুরআনকে ভালোভাবে বুঝা সম্ভব।
৪. কোন বিষয়েই মাত্রাতিরিক্ত তর্কে জড়াবে না। কেননা এটা কোন সময় সফলতা বয়ে না।
৫. কখনোই বেশি হাসবে না কেননা আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত আত্মা সবসময় শান্তচিত্ত ও ভারি হয়।
৬. কখনোই মশকরা কর না। কেননা একটি মুজাহিদ জাতি গাম্ভিরতা ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না।
৭. শ্রোতা যতটুকু পছন্দ করে ঠিক ততটুকুতেই তোমার আওয়াজকে সীমাবদ্ধ রাখো । কেননা এটা স্বার্থপরতা ও অন্যকে নিপীড়ন করার শামিল।
৮. কখনোই কাউকে ছোট কর না। কল্যাণ কর ছাড়া অন্য কোন ব্যাপারে কথা বল না।
৯. তোমার প্রতিবেশী কোন ভাই তোমার সাথে পরিচয় হতে না চাইলেও তার সাথে পরিচিত হও।
১০. আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব আমাদের যে সময় দেওয়া হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশী। অন্য জনের সময় বাঁচানোর জন্য সবসময় ব্রত হও। যদি তোমার উপর কোন দায়িত্ব অর্পিত হয় সেটাকে সব চেয়ে সহজ পন্থায় ও সুন্দর করে করার চেষ্টা কর।
১১. সবসময় পরিষ্কার পরিছন্নতার দিকে নজর দিবে। তোমাদের ঘরবাড়ি; পোশাক পরিচ্ছদ; শরীর ও তোমাদের কাজের জায়গাকে পরিচ্ছন্ন রাখো। কেননা এই দ্বীন পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার উপরেই নির্মিত হয়েছে।
১২. তোমাদের ওয়াদা; তোমাদের কথা ও কাজে সবসময় মিল রাখবে। শর্ত যাই হোক না কেন সর্বদায় এর উপর অটল অবিচল থাকবে।
১৩.পড়ালেখায় মনোযোগ দাও। মুসলিমদের প্রকাশিত পত্রপত্রিকা ও ম্যাগাজিন নিয়ে পরস্পর আলোচনা কর। ছোট করে হলেও নিজস্ব একটা লাইব্রেরি গড়ে তুলবে। নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে গভীর জ্ঞানের অধিকারী হওয়ার চেষ্টা কর।
১৪. কখনো সরকারের মুখাপেক্ষী হবে না। কেননা রিজিক এর সবচেয়ে সংকীর্ণ দরজা হল তাদের দরজা। তবে তোমাদের কে যদি সুযোগ সুবিধা দেয় সেটাকে প্রত্যাখ্যান কর না। তোমাদের দাওাতকে ও তোমাদের নিজস্ব গতিকে স্তব্ধ করে না দেওয়া পর্যন্ত এর থেকে পৃথক হবে না।
১৫. তোমাদের সম্পদের একটা অংশ সংগঠনে দান কর। আর ফরজ যাকাত একসাথে করে দাও। সেটার পরিমান যত স্বল্পই হোক না কেন সেখান থেকে গরীব দুঃখীদের দান কর।
১৬. অপ্রত্যাশিত বিপদ আসার আগেই স্বল্প পরিমান হলেও সম্পদের একটা অংশ কে সঞ্চয় করে রাখো। এবং কখনোয় জাঁকজমক পূর্ণ আসবাব পত্র ক্রয়ে সম্পদ ব্যয় কর না।
১৭. সকল অবস্থায় তাওবা ও ইস্তিগফার পাঠ কর।রাতে ঘুমানোর আগে কয়েক মিনিট আত্ম সমালোচনা কর। হারাম থেকে বেঁচে থাকার জন্য সন্দেহ জনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকো।
১৮. বিনোদন এর জায়গা থেকে এই ভেবে দূরে থাকো যে এর বিরুদ্ধেই আমার সংগ্রাম। সকল প্রকার প্রসন্নতা ও আরাম দায়ক বিষয় থেকে দূরে থাকো।
১৯.সকল জায়গায় তোমার দাওয়াত কে বুলন্দ করার চেষ্টা করবে। নিজের নফস এর সাথে এমন আচরন কর যাতে সে তোমাকে মেনে চলতে বাধ্য হয়। তোমাদের চোখকে হারাম থেকে বিরত রাখো। নিজের আবেগ এর উপর প্রাধান্য বিস্তার কর।
২০.নিজেকে সর্বদায় সংগঠন এর কাজের সাথে সম্পর্কিত রাখো এবং একজন নিবেদিত প্রান সেনার মত নেতার আদেশ মানতে সর্বদায় প্রস্তুত থাকো ।
.
“আমাদের এমন প্রজন্ম প্রয়োজন যারা ইসলামকে আঁকড়ে ধরে রাখবে, ইসলাম তাদেরকে ধরে রাখবে এমন নয়।”
– ইমাম হাসান আল-বান্না (রাহিমাহুল্লাহ