মুসলিম ব্রাদারহুড এর পরিচয়।

0
168

সামাজিক কল্যাণমূলক কাজ করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে ইসলামি ভাবধারার সংগঠন ইখওয়ান তথা মুসলিম ব্রাদারহুডের যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তীতে সংগঠনটি মিশরে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলে এবং ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। এযাবৎকালের মুসলিম বিশ্বের যত আন্দোলন হয়েছে তার মধ্যে মুসলিম ব্রাদারহুড সবচেয়ে পুরনো ৷ প্রাথমিকভাবে সংগঠনটির মূলমন্ত্র ছিল ‘ইসলাম ইজ দ্য স্যলিউশন’ ৷ একসময় মূল লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে বিভিন্ন কারণে সহিংসতার পথ বেছে নিলে বিতর্কিত হয়ে পড়ে সংগঠনটি ৷ বর্তমানে বিভিন্ন দেশ সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে মুসলিম ব্রাদারহুডকে ৷ তবুও নানা ঘাত-প্রতিঘাত, বাধা-বিঘ্ন পেরিয়ে মুসলিম ব্রাদারহুড জিইয়ে রেখেছে তাদের মতাদর্শ ৷ বিশ্বের অনেক দেশে এখনো লাখ লাখ অনুসারী রয়েছে মুসলিম ব্রাদারহুডের ৷

আরববিশ্বের সবচেয়ে পুরাতন ইসলামি সংগঠন ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’ (Muslim Brotherhood) নামটি মূলত ইংরেজিতে হলেও মিশরের লোকজন আরবিতে ইখওয়ানুল মুসলিমীন অর্থাৎ ‘মুসলমানদের ভ্রাতৃত্ব’ বলে থাকেন। সংগঠনটি আরববিশ্বের হলেও সেখানকার কিছু কিছু দেশে এটি নিষিদ্ধ রয়েছে৷ শুরু থেকেই তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল মিশরকে একটি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং আরব বিশ্বে বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা সংস্কারের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা

মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাতা হাসান আল-বান্না ৷ তাঁর আহ্বানে সাড়া প্রদানকৃত আগ্রহশীল একটি জনগোষ্ঠী নিয়ে ১৯২৮ সালে “মুসলিম ব্রাদারহুড” নামক সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি৷ কোন সংগঠনই একদিনে হঠাৎ করে প্রতিষ্ঠা হয়ে যায় না ৷ ধীরে ধীরে এর বীজ বপন করা হয় ৷ তেমনি মুসলিম ব্রাদারহুডও হাসান আল-বান্নার অনেকদিনের লুকায়িত স্বপ্নই বলা চলে ৷ মুসলিম ব্রাদারহুডের গোড়াপত্তন কি প্রেক্ষিতে হয়েছিল বা এর উদ্দেশ্য কি ছিল তা জানতে একটু পেছন ফিরে দেখা যাক ৷

মিশরের কায়রোতে জন্মগ্রহণ করা হাসান আল-বান্না প্রারম্ভিক জীবনে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষাও গ্রহণ করেন ৷ কায়রোর দার আল-উলুম কলেজে পড়াকালীন সংস্কারপন্হী রশিদ রিদার সাথে পরিচয় ঘটে এবং রিদার আদর্শে তিনি ইসলামী সালাফিয়া আন্দোলনের একজন ঘোর সমর্থক এবং পাশ্চাত্য ভাবধারার চরম বিরোধী মতবাদে বিশ্বাসী হন ৷ ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ বিরোধী মিশরীয় বিপ্লবের সময় তিনি উপনিবেশবাদের নির্মমতার কথা উপলব্ধি করেন এবং ব্রিটিশ তথা পাশ্চাত্য বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন ৷ তখন থেকে তিনি ধর্ম এবং রাজনীতির যে সম্পর্ক তা নিয়ে গভীর তাত্ত্বিক অনুসন্ধানে ব্রতী হয়ে মুসলিম ব্রাদারহুডের আদর্শিক ভিত্তি রচনা করেন ৷

১৯২৭ সালের দিকে প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা করাকালীন সময়ে তিনি অনুধাবন করেন কুরআন এবং সুন্নাহর আদর্শেই কেবলমাত্র মুসলিম সমাজের অগ্রযাত্রা সম্ভব এবং এই আদর্শকে রূপায়িত করতে হলে প্রচারণার প্রয়োজন ৷ চমৎকার বাগ্মীতার অধিকারী বান্না শীঘ্রই মসজিদে, কফি হাউসে এবং উন্মুক্ত স্হানে প্রচারণা শুরু করে গোড়াপত্তন করেন মুসলিম ব্রাদারহুডের ৷ বান্নার মতে পাশ্চাত্যকরণই মিশর এবং ইসলামের উন্নতির প্রধান অন্তরায় ৷ এই অন্তরায়কে অতিক্রম করতে হলে মিশরবাসীদের মহানবী এবং খোলাফায়ে রাশেদুনের আমলে ফিরে যেতে হবে এবং তাঁদের তাত্ত্বিক আদর্শেই মিশরের রাজনীতিকে পরিচালিত করতে হবে ৷ এই আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি প্রাথমিকভাবে ছয়জন অনুসারী নিয়ে সামাজিক ও শিক্ষনীয় কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন এবং অতি অল্প সময়েই বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন৷ সুয়েজ ক্যানাল কোম্পানির সহায়তায় নির্মিত মসজিদকেই ব্রাদারহুডের সদর দফতর হিসেবে ব্যবহার করতেন তাঁরা ৷ বহুজাতিক ও ঔপনিবেশিক কোম্পানির ফাঁদ থেকে শ্রমিকদের রক্ষা করাও তাঁর বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনার অংশ ছিল ৷ বান্না নারী অধিকার ও তাদের জন্য সুবিচারের পক্ষে কথা বললেও নারী-পুরুষ সমতার বিপক্ষে ছিলেন ৷

১৯৩৩ সালে বান্না কায়রোতে এসে “আল-ইখওয়ান আল-মুসলিমীন” নামক একটি সাপ্তাহিক জার্নালের মাধ্যমে তাঁর দর্শন ও কার্যবিধি মিশরে ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন ৷ ১৯৪৯ সালে নিহত হবার পূর্ব পর্যন্ত তাঁর দলের সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লক্ষ এবং দলের শাখা অফিসের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার ৷ গোপনীয় সংস্হা পরিচালনাও আরম্ভ করেছিলেন তিনি ৷

মুসলিম ব্রাদারহুডের মতাদর্শ

বিভিন্ন আদর্শ মেনে চলার প্রত্যয়ে গঠিত হয়েছিল মুসলিম ব্রাদারহুড ৷ তাদের মতাদর্শ সম্পর্কে যেসব তথ্য পাওয়া যায়:-

কোরআনের বিশ্লেষণ ও আজকের বৈজ্ঞানিক জগতে তার প্রয়োগ ঘটানো ৷
ঘনিষ্ঠতর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ইসলামি আইন-কানুনসমূহের সঠিক ব্যাখ্যা নিরূপণের জন্য ইসলামি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ৷
সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থনৈতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও সামাজিক শ্রেণিসমূহের পুনর্বিন্যাস ৷
বিশ্ব মুসলিম জীবনমান উন্নত করার জন্য দারিদ্র্য, অস্বাস্থ্য ও অজ্ঞতার বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা এবং
বিদেশি প্রভুত্ব বা শোষণ থেকে মুসলিম দেশগুলোকে মুক্ত করা ও পৃথিবীর সর্বত্র মুসলমান সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষা করা।

বান্নার অনুসারী
মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রথম ধাপের পরিসমাপ্তি
১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে বান্নার অনুসারীদের হাতে কায়রোর প্রধান পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হলে রাজা ফারুক তাদের কার্যক্রমকে রাষ্ট্রের স্হিতিশীলতার জন্য হুমকি মনে করে মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং বহু সংখ্যক সদস্যকে কারারুদ্ধ করেন ৷ কিন্তু বান্নাকে পর্যবেক্ষণে রাখেন ৷ এতে ক্রুদ্ধ এক ব্রাদারহুড সদস্য মিশরের প্রধানমন্ত্রী নুকরাশি পাশাকে হত্যা করে ৷ ১৯৪৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রতিশোধপরায়ণতায় পুলিশ সংস্হার গোপনীয় বাহিনীর হাতে বান্না নিহত হয় ৷ আর এর সাথেই পরিসমাপ্তি ঘটে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রথম ধাপের কার্যাবলি ৷ তাঁর অনুসারীরা তাঁকে শহীদ হিসেবে আখ্যায়িত করে ৷

বান্নার মৃত্যুর পর প্রায় ধুঁকতে থাকা মুসলিম ব্রাদারহুডের হাল ধরেন হাসানুল হোদায়বী ৷ সেই সময় মিশরীয় লেখক সাঈদ কুতবও সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ৷ উচ্চশিক্ষার জন্য দুই বৎসর আমেরিকায় অবস্হান কালে পাশ্চাত্যমুখী কুতব অনৈতিকতা এবং ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলের উত্থানে আমেরিকার সমর্থন লক্ষ্য করে ঘোর আমেরিকা বিরোধী হয়ে যান ৷ ১৯৫০ সালের দিকে মিশরে ফিরে তিনি মুসলিম ব্রাদারহুড পুনর্জ্জীবনে উৎসাহী হন এবং ইসলাম ও রাষ্ট্রতত্ত্ব সম্বন্ধে অনেক উগ্রপন্থাধর্মী গ্রন্থ রচনা করেন ৷ তিনি গোপনীয়ভাবে কার্যক্রম শুরু করলে প্রেসিডেন্ট গামাল/জামাল আবদেল নাসের তাঁকে কারারুদ্ধ করেন ৷ পরবর্তীতে তিনি মুক্তি লাভ করলেও আবারো পূর্বপন্থায় ফিরে যান ৷ ১৯৫২ সালের দিকে নাইট ক্লাব, থিয়েটার, হোটেলসহ ৭৫০টি গুরুত্বপূর্ণ ভবনে আগুন দেয়ার মাধ্যমে ধ্বংসযজ্ঞের পথ বেছে নেয় মুসলিম ব্রাদারহুড এমনটিই ধারণা করা হয় ৷

নাসের

প্রেসিডেন্ট নাসেরও ১৯৫৪ সালে মুসলিম ব্রাদারহুডকে বেআইনি ঘোষণা করেন ৷ শীর্ষনেতা হোদায়বীকে গ্রেফতার করা হয় সেবছর ৮ অক্টোবর। কর্নেল নাসের ব্রাদারহুডের কেন্দ্রীয় অফিসসহ চারশ শাখা অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেন। ব্রাদারহুড কর্তৃক পরিচালিত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল ও কো-অপারেটিভ প্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ করে দেয়া হয় ৷ নাসেরের সময় ব্রাদারহুডের নেতাকর্মীদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হতো ৷ এমনকি ব্রাদারহুড কর্মীদের নির্যাতনের জন্য তিনি নির্যাতন সেল (কনসেনট্রেশন ক্যাম্প) গড়ে তুলেছিলেন ৷ হোদায়বীর সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডের আরও কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার করে সামরিক আইনে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। তবে মুসলিম বিশ্বের চাপের মুখে হোদায়বীর দণ্ড কার্যকর না করে বাকিদের মৃত্যুদন্ড বহাল রাখা হয় ৷ তিনি আমৃত্যু ব্রাদারহুডের সঙ্গে ছিলেন ৷

১৯৬৫ সালে নাসের মস্কো সফরকালে এক বিবৃতিতে বলেন, মুসলিম ব্রাদারহুড তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল। এমন সন্দেহে নাসেরের নিরাপত্তা বাহিনী ব্রাদারহুডের প্রায় ১৮ হাজার কর্মীকে নির্যাতন ও গ্রেফতার করে। সেসময় মুসলিম ব্রাদারহুডের মহিলা শাখার শীর্ষ নেত্রী জয়নব আল-গাজালীকে ২৫ বছরের জন্য সশ্রম কারাদন্ড দেয়া হয় ৷ বন্দীদশায় তাঁর উপর যে পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয় “কারাগারের রাতদিন” নামক বইয়ে এর বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে ৷

সহিংসতার মাধ্যমে অনৈসলামিক সরকারকে উৎখাত এবং পলিটিকাল ইসলামের প্রবক্তা ব্রাদারহুডের নেতা কুতবকে নাসের প্রশাসন ফাঁসি দেয় ১৯৬৬ সালে। তাঁকেও শহীদ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় ৷ রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে ব্রাদারহুড নেতা-কর্মীদের উপর নির্মম অত্যাচার চালানো হলেও পরবর্তীতে জানা যায় এই অভিযোগ সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার সাজানো নাটক ছিল কেবল মাত্র ৷

সাঈদ কুতব তার পূর্বসূরী হাসান বান্না এবং পাকিস্তানের মওলানা মওদূদীর আদর্শিক তত্ত্ব দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন ৷ তবে তাঁর মতামত উপরোক্ত দুজনের চেয়ে অধিক উগ্র এবং জঙ্গী মনোভাবাপন্ন ছিল ৷ তিনি মনে করতেন ইসলামী শাসনতন্ত্র পাশ্চাত্যবাদের বিকল্প ধারা নয়, আবশ্যিক কর্ম ৷ এই কর্ম সম্পাদনে প্রয়োজনে সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষপাতী ছিলেন তিনি ৷ অর্থাৎ সশস্ত্র জিহাদে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি ৷

ব্রাদারহুডের নেতৃবর্গের ফাঁসির পেছনে সুয়েজ খালে ইংরেজদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সম্পর্ক জড়িত ছিলো। কারণ ব্রাদারহুড সুয়েজ খাল সম্পর্কে ইংরেজ ও মিশরের সংলাপের ঘোর বিরোধী ছিলো । নাসেরের তৎপরতায় বিশ্ব দরবারে মুসলিম ব্রাদারহুডের পতন ঘটলেও ফিনিক্স পাখির মতো বারবারই নতুন উদ্দ্যমে শুরু হয় মুসলিম ব্রাদারহুডের কার্যক্রম ৷

ব্রাদারহুড কর্মীরা বিভিন্ন সময়ে সহিংসতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে ১৯৭০ সালের দিকে আনোয়ার সাদাতের আমলে তারা সহিংসতার পথ বিসর্জনের ঘোষণা দেয়। আবারও হাসান বান্না প্রবর্তিত সংগঠনের মূল আদর্শে ফিরে এসে শিক্ষা ও জনহিতকর কর্মকাণ্ড শুরু করে ৷ সাদাত ১৯৭১ সালে কনসেনট্রেশন ক্যাম্প বন্ধ করে দেয় এবং ব্রাদারহুডের আটক নেতা-কর্মীদেরকে ধীরে ধীরে মুক্তি দিতে শুরু করে ৷

তাঁর আমলে মুসলিম ব্রাদারহুডকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর অনুমতি দেয়া হয়। তবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়নি। ১৯৭৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে উঠা রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। মুসলিম ব্রাদারহুডসহ সব বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদেরকে গণহারে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেন সাদাত ।

সাদাত
সাদাতের পর ১৯৮১ সালে ক্ষমতায় আসেন হোসনি মোবারক। তার আমলেও ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ থাকে। সংগঠনটিকে কোন প্রকাশনা বা সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয় না এবং কোন কারণ ছাড়াই আটক করার নিয়ম করেন মোবারক। তাঁর আমলে মুসলিম ব্রাদারহুড গোপনে গোপনে উন্নতি করতে থাকে। ব্রাদারহুডের অগ্রযাত্রা থামাতে পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেন মোবারক। সমস্ত পেশাদারি সংগঠনগুলোকে সরাসরি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। ব্রাদারহুডের কয়েক হাজার নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়। ২০০৫ এর সংসদীয় নির্বাচনে ব্রাদারহুড জয়লাভ করলেও মোবারক সরকার এই দলকে বেআইনী ঘোষণা করে । এরপর ২০১১ সালে যুগান্তকারী আরব বসন্তের হাওয়ায় মোবারক সরকারের পতন হলে মিশরে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১২ সালের জুনে। তখনই মুসলিম ব্রাদারহুড জনসম্মুখে আসে। তবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সময় তারা এফজেপি (ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস পার্টি) নামে অংশ নেয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করেন মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসি।

হোসনি মোবারক
মুসলিম ব্রাদারহুডের উল্লেখযোগ্য সফলতা
মুসলিম ব্রাদারহুডের এক অভূতপূর্ব সাফল্যই বলা চলে মুরসির জয় ৷ এর ফলে ব্রাদারহুড মিশরের সাধারণ মানুষের নেতৃত্বের সামনে চলে আসে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতির নির্বাচনে ব্রাদারহুড নেতা মুরসি ক্ষমতায় এলেও তিনি এমন এক পরিস্থিতিতে হাল ধরেন যখন দেশে না ছিল পার্লামেন্ট, না ছিল স্থায়ী কোন সংবিধান ৷ তবুও বেশ দৃঢ়তার সাথেই রাষ্ট্র পরিচালনা করছিলেন তিনি ৷ মুসলিম ব্রাদারহুড ক্ষমতায় আসার পর নারীদের বিভিন্নভাবে ক্ষমতায়নের চেষ্টা করে ৷ এছাড়াও নিরক্ষরদের শিক্ষা দেয়, বহু হাসপাতাল এমনকি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও গড়ে তোলে ।

এক বছরের মাথায় ২০১৩ সালের ৩ জুলাই সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন মুরসি। মিশরে মুরসি সরকার উৎখাত হবার পর হাজার হাজার ব্রাদারহুড কর্মী গ্রেফতার বা নিহত হন। মুরসি সমর্থকরা টানা ৪১ দিন মিশরের রাজপথে অবস্হান করেন মুরসিকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে ৷ মিশরীয় সেনাবাহিনী ব্রাদারহুডের সেই শান্তিপূর্ণ অবস্থানে কয়েক দফা গণহত্যা চালায় ৷ অনেক পর্যবেক্ষকই মনে করেন, ব্রাদারহুডের নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশে গণহত্যা চালিয়ে মিশরীয় নিরাপত্তা বাহিনীই আসলে সন্ত্রাসী সংগঠনে পরিণত হয়েছে । অসংখ্য অনুসারীরা কাতার এবং তুরস্কে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন সেসময় ৷

মুসলিম ব্রাদারহুডের বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতিঃ
মুসলিম ব্রাদারহুড কখনোই বিলীন হয়ে যায়নি ৷ গোপনে হলেও তারা কার্যক্রম চালিয়ে গেছে ৷ তবে এতো বছরে মুসলিম ব্রাদারহুডের মতাদর্শের সাথে সাথে বদলে গেছে অনেক নেতাও। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য একটাই, ইসলামি আইন দিয়ে দেশ পরিচালনা করা ৷ জন্মভূমি মিশর ছাড়াও আরববিশ্বের অনেক লোক তাদের মতাদর্শে বিশ্বাস করে। ফিলিস্তিনের হামাস, তিউনিসিয়ার ইন্নাহদা পার্টি, কুয়েতের ইসলামি কন্সটিটিউশনাল মুভমেন্ট তাদের সমর্থন করে। জর্ডানে ইসলামি অ্যাকশন ফ্রন্টের প্রতিনিধিত্ব করে মুসলিম ব্রাদারহুড। জর্ডানের পার্লামেন্টের বৃহত্তম ব্লকের রাজনৈতিক দল এই ইসলামি অ্যাকশন ফ্রন্ট। বাহরাইনের রাজনৈতিক দল মিনবারও ব্রাদারহুড সমর্থন করে।

২০১৪ সালে সৌদি আরব সুন্নি মতবাদে বিশ্বাসী মুসলিম ব্রাদারহুডকে জঙ্গি সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দেয়। নেপথ্য কারণ হিসেবে ধারণা করা হয় ব্রাদারহুড আবার রাজনীতিতে অংশ নিলে এবং নির্বাচনী বৈধতা পেলে ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে সৌদি আরব অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে ৷

মোহাম্মদ বাদি

২০১৭ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে মিশর, সংযুক্ত আরব অামিরাত, রাশিয়া ও বাহরাইনসহ আটটি দেশ কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করলে আবারও আলোচনায় আসে মুসলিম ব্রাদারহুড ৷ এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও মুসলিম ব্রাদারহুডকে কখনোই ভাল চোখে দেখেনি। তাই মার্কিন প্রশাসনের নিকট মুরসি সরকার গ্রহণযোগ্যতাও পায়নি ৷ ট্রাম্প সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার মাঝে মুসলিম ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ ঘোষণা করাও রয়েছে ৷ তবে ব্রিটেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে মানতে নারাজ ৷

এখনো প্রতিনিয়ত গ্রেফতার হচ্ছেন ব্রাদারহুড কর্মীরা ৷ শীর্ষস্হানীয় নেতা মোহাম্মদ বাদিসহ বেশ কয়েকজন নেতাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের আদেশ দেয়া হয় ২০১৭ সালে ৷

মুসলিম ব্রাদারহুড ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী নয়- আরব জাতীয়তাবাদেও নয় ৷ তারা ইসলামী উম্মাহর সার্বজনীনতায় বিশ্বাসী ৷ বর্তমানে সংগঠনটির সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে অনৈক্য। তাদের অতীত কর্মকাণ্ড এবং মিশরের বর্তমান পরিস্থিতিতে কি করণীয়, এসব নিয়ে ব্রাদারহুডের নানা গোষ্ঠীর মধ্যে মতপার্থক্য আছে। এক পক্ষ আছেন যারা আগের মত ধীরে ধীরে পর্যায়ক্রমে এগুতে চান। অন্য পক্ষ মিশরের রাষ্ট্রীয় শক্তিকে মুখোমুখি মোকাবিলা করতে চান ৷ ব্রাদারহুডের সদস্যরা বিশ্বাস করেন তাদের মূল উদ্দেশ্য ইসলামী রাষ্ট্র স্হাপন প্রারম্ভিকে মহানবীর সময়ের ন্যায় বাধাগ্রস্ত হতে পারে, তবে শেষ পর্যন্ত তাদের বিজয় অবশ্যম্ভাবী৷