মুজাহিদে আজম -আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহঃ)

0
43

ভারতীয় উপমহাদেশের কুরআন-সুন্নাহ ও আধুনিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ যে কয়েকজন ক্ষণজন্মা পুরুষ জন্ম নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে আলেম শামসুল হক ফরিদপুরী (রহঃ)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৮৯৫ সালে গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সকলের কাছে সদর সাহেব হুজুর নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি জাতীয় জীবনের বিভিন্ন কর্মকা-ে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থেকে কুরআন ও সুন্নার আলোকে মানুষকে হেদায়েত করতেন। আমাদের দেশে সাধারণত আলেম-ওলামাদের মধ্যে দেশ ও জাতির বিভিন্ন সমস্যার ব্যাপারে উদাসীনতা পরিলক্ষিত হয়। সমাজের অবিচার-অনাচার ও ইসলাম পরিপন্থী কাজ দূরীভূত করে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সমাজ গড়ে তোলার চেয়ে তারা নিজেদেরকে ইবাদত-বন্দেগী, জিকির-আজকার নিয়ে বেশি ব্যস্ত রাখেন। বলা যয় অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই তারা সমাজ থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখতে চান। এদিক থেকে আলেম শামসুল হক ফরিদপুরী (রহঃ) ছিলেন একজন ব্যতিক্রমী চরিত্রের মানুষ। তিনি একদিকে যেমন ছিলেন সুফি মানুষের অধিকারী, তেমনি অন্যদিকে ছিলেন পরিপূর্ণ সমাজসচেতন এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শের প্রতীক। বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের ঘটনাপ্রবাহের প্রতি ছিল তার সতর্ক দৃষ্টি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

তিনি কারো রক্তচক্ষুকে পরোয়া না করে জাতীয় জীবনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে সাহসী ভূমিকা পালন করে গেছেন। সদর সাহেব ছিলেন সহজ সরল, বিনয়ী, ন¤্র ও মিষ্টভাষী। দেশের রাজনীতি, অর্তনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, সাংবাদিকতাসহ সমাজের সকল স্তরে ইসলামী জীবন আদর্শের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। শিক্ষা-সাহিত্য অঙ্গনে তিনি বিরাট অবদান রেখে গেছেন। ইসলামী শিক্ষার প্রসারে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন প্রচুর কওমী মাদরাসা। এর মধ্যে ঢাকার লালবাগ মাদরাসা, বড় কাটারা মাদরাসা, ফরিদাবাদ ও গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা মাদরাসা অন্যতম। এছাড়া তিনি দেশে ইসলামী সমাজ ও ইসলামী শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। সদর সাহেব বার্ধক্যজনিত কারণে জীবনের শেষদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত না থাকলেও ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের সাথে তার যোগসূত্র ছিল। দলমত নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর আলেম এবং মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন জোরদার করাই ছিল তার লক্ষ্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, ইসলামী শিক্ষা ও জেনারেল শিক্ষা ব্যবস্থায় পার্থক্য থাকলেও মুসলমান হিসেবে তাদের মধ্যে কোন বিভেদ থাকতে পারে না। এ বিভক্তি মুসলমানদের পশ্চাদপদতার কারণ। তিনি আরো বলতেন, ধর্মহীন কর্ম শিক্ষা আর কর্মহীন ধর্ম শিক্ষার কোনো মূল্য নেই- এর সমন্বয় প্রয়োজন। সদর সাহেব বিভিন্ন সামাজিক কুসংস্কার, শিরক ও বিদআ’তের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। আমাদের দেশে একশ্রেণীর আলেম ও পীর ধর্মকে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি এ শ্রেণীর আলেম ও পীরদের কঠোর ভাষায় নিন্দা করতেন। দেশের ইসলামী নেতৃবৃন্দ ও আলেম সমাজের বিভিন্ন জাতীয় সমস্যায় ঐক্যবদ্ধ রায়ের বিরোধিতা করে কোনো আলেম বা পীর ক্ষমতাসীন সরকারের অনুসৃত ভ্রান্ত নীতিকে সমর্থন করলে তিনি তাদের কঠোর সমালোচনা করতেন। ধর্মীয় ব্যাপারে কোন সমস্যা দেখা দিলে তা নিরসনের জন্য তিনি এগিয়ে আসতেন। মুসলিম সমাজের ধর্মবিমুখতা ও সমাজের ক্রমবর্ধমান নৈতিক অবক্ষয় নিঃস্বার্থবাদী সমাজ দরদি ব্যক্তিটিকে বিচলিত করে তুলতো। এ দুরবস্থা থেকে সমাজকে রক্ষার জন্য তিনি সর্বদা চেষ্টা করতেন। শিক্ষাব্যবস্থাসহ সমাজের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর তিনি প্রাদান্য দিতেন। মানুষকে সৎ, খোদভীরু, নিষ্ঠাবান ও সর্বোপরি ইসলামী আদর্শের অনুসারী করে গড়ে তোলার ব্যাপারে চল্লিশের দশক থেকেই তিনি বাংলাভাষায় লোখািেখ ও গ্রন্থ রচনায় মনোনিবেশ করেছিলেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তিনি বাংলা ভাষায় দুই শতাধিক গ্রন্থ রচনা করে গেছেন।

তাছাড়া বিদেশী ভাষাভাষী মনীষীদের বহু গ্রন্থ তিনি বাংলাভাষায় অনুবাদও করেছেন। তার লিখিত এসব গ্রন্থ কেবল বাংলা সাহিত্যভা-ারের অমূল্য সম্পদ নয়-মানুষকে কর্মশীল চরিত্রবান, নিষ্ঠাবান, ন্যায়পরায়ণতা, খোদাভীরুকরণ ও সমাজসংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তিনি একাধারে ছিলেন শিক্ষাবিদ, সংস্কারক, লেখক, সমাজদরদী নেতা এবং মানব কল্যাণে নিয়োজিত নিঃস্বার্থ পীর। তিনি সকল শ্রেণীর মানুষের শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন। নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে তিনি কখনো অন্যায় অসত্যের সাথে আপস করতেন না। লোভ-প্রলোভন ও চাপের মুখে তিনি নতি স্বীকার করতে জানতেন না। দেশ-বিদেশে সদর সাহেবের অসংখ্য ভক্ত ছড়িয়ে আছে। শত শত ছাত্র তার কাছে ইসলামী শিক্ষা লাভ করে ধন্য হয়েছেন। সদর সাহেবের মতো নির্ভীক, আদর্শবান, খোদাভীরু এবং মান কল্যাণে সর্বদা নিয়োজিত আলেমের নেতৃত্বে ঘুণে ধরা সমাজের জন্য এ মুহূর্তে কতো প্রয়োজন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ মহান মনীষী ১৯৬৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ইন্তিকাল করেন। তর জীবন ও কর্ম হোক আমাদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।