ভারতে তাবলীগের বর্তমান অবস্থা

0
77

সাদ সাহেবের চরম বিতর্কিত বয়ানকে কেন্দ্র করে তাবলীগের মাঝে ভাঙন দেখা দেয়। ভারত, বাংলাদেশ সহ গোটা পৃথিবীতেই এর প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশের অবস্থা তো আমাদের সামনে। পাকিস্তানের পরিবেশও অনেক স্থিতিশীল। ভারতে যেহেতু তাবলীগের বিশ্ব মারকায, তাই ওখানের পরিস্থিতি জানতে অনেকেই মুখিয়ে আছেন। আমি নিজেও বিষয়টার প্রতি আগ্রহী ও যত্নশীল। গত ৮/৯ দিনের ভারত সফরের সময় কোলকাতা, দিল্লি, দেওবন্দ, সাহারানপুর ও বোম্বে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। বিভিন্নজনের কাছ থেকে বিভিন্নধর্মী মন্তব্য ও বিশ্লেষণ শুনেছি।

১. ভারতে সাদপন্থীরা গণ্ডগোলের শুরুর দিকে বেশ শক্তিশালী ছিল। শুরায়ী নেজাম বা আলমী শুরাপন্থীদের শক্তি ও জনবল ছিল একেবারে কম। তার কারণ হল, সাদপন্থীগণ বুঝাত যে, তাবলীগের এই ঝামেলা নেতৃত্বের। লাট সাব, ইবরাহীম দেওলা সাহেবরা নেতা হতে চায়, অথচ তাবলীগের আমীর তো মাওলানা সাদ সাহেব। এসব মিথ্যা কথা প্রচার করত। কিন্তু বিষয়টি যে কেবল নেতৃত্বের নয় বরং আকিদার, সেটি বুঝতে দেওয়া হতো না। আস্তে আস্তে জনগণ বুঝতে শুরু করেছে বিষয়টা।
সাদ সাহেব তাবলীগের প্রতিষ্ঠাতার বংশধর এবং দীর্ঘদিন যাবত বিশ্বের নানা প্রান্তের ইজতেমাগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাকে বয়ান দেওয়া হতো, তাবলীগ পরিচালনায় লাট সাহেব, দেওলা সাহেব এমনকি মাওলানা তারেক জামিল সাহেবের তুলনায় সাদ সাহেবকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। যে কারণে সাদ সাহেবের ভক্তবৃন্দ অনেক বেশি। এমন জনপ্রিয় লোকের বিরুদ্ধে হঠাৎ করে কিছু বললে বিশ্বাস করা মুশকিল। তাই তার মুখোশ খুলতে দেরি হয়েছে।

২. বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশের মতো ভারতে ওয়াজাহাত করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের আলেমগণ যেভাবে সাদ সাবের বিপক্ষে মাঠে নেমেছেন, সেখানে তেমনটা হয়নি। এর অবশ্য অনেক কারণ থাকতে পারে। একটি হিন্দু অধ্যুষিত রাষ্ট্রে মুসলমানদের বিবাদ সামনে না আনাই মঙ্গলজনক। তাছাড়া মোদি সরকার সাদের পক্ষের। শোনা যায়, মোদির সাথে সাদ সাবের ব্যবসা রয়েছে।
ভারত একটি বিশাল রাষ্ট্র। একেক এলাকার একেক ভাষা। কেরালা, মাদ্রাজ ইত্যাদি এলাকার লোকজন উর্দু/হিন্দি বুঝে না। যে কারণে সাদ সাহেবের গোমরাহিগুলো তারা বুঝতে দেরি হয়। এবং সবাইকে নিয়ে একত্রে ওয়াজাহাতী সমাবেশ করাও মুশকিল।

৩. বর্তমানে ভারতে সাদ সাহেবের পক্ষের লোক শতকরা ৩০% হতে পারে। কেউ কেউ আরও বেশি, কেউ কেউ আরও কম বলেছেন। আলেমদের ৯০%ই সাদ সাবের বিপক্ষে। ভূপালে একসময় সাদ সাহেবের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল, এখন হ্রাসের পথে। বর্তমানে মাশরেকী ইউপির কিছু এলাকায় সাদ সাবের লোকজন বেশি। সব জায়গায়ই সাদের লোকজন কমছে। গত রোববার বোম্বের রাহমানিয়া মাদরাসায় শুরায়ী নেজামের জোড় চলছি। হাজার হাজার মানুষের সমাগম।

৪. নদওয়ার মাওলানা সালমান নদভী ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো আলেম সাদ সাবের পক্ষাবলম্বন করেনি। সালমান সাহেবও সরাসরি সাদ সাহেবের মতবাদ বিশ্বাস করে, এমন কথা আমি শুনিনি। দেওবন্দ, সাহারানপুর, নদওয়া, আক্কেলকুয়া সহ ভারতের বড় বড় সব প্রতিষ্ঠান সাদের বিরোধী, সবাই আলমী শুরায়ী নেজামের পক্ষে। আলহামদুলিল্লাহ

৫. ভারতে এবং বাংলাদেশেও, একসময় যারা সাদ সাহেবের ভুল ধরত, সবার আগে তারাই সাদ সাহেবের বয়ানের ভুলগুলো ধরছিল, এখন তারাই সাদের পক্ষে! এমন কয়েকজনের নাম মুরুব্বিরা আমাদেরকে বলেছেন। স্বার্থের কারণেই এমনটা হচ্ছে!

৬. দারুল উলুম দেওবন্দের ক্যাম্পাসের ভেতরে সাদ সাহেবের পক্ষের ছাত্র এবং শুরায়ী নেজামের ছাত্রদের মাঝে তর্কবিতর্ক হয়, হাতাহাতি পর্যন্ত গড়ায়; তাই কতৃপক্ষ বাধ্য হয়ে ক্যাম্পাসের ভেতর তাবলীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। নইলে মাদরাসার ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

৭. অনেক জনগণ এমকি অনেক তাবলীগিও এসব ঝামেলার মূল কারণ জানে না। তাবলীগ দুই ভাগে বিভক্ত হওয়াতে তারা সীমাহীন কষ্ট পেয়েছে, তারা কাজ করতে চায়, সবাইকে মিলেমিশে থাকতে দেখতে পছন্দ করে। সম্ভব হলে মূল কারণগুলো তাদের সামনে স্পষ্ট করা।

৮. তাবলীগের আমির না হলেও মূল বা প্রধান কিংবা পুরোধা ব্যক্তিত্ব সাদ সাহেবের ভুল ও ভ্রান্তিমূলক বয়ানগুলো প্রমাণ করে, যে কোনো মানুষ দ্বারা ভুল হওয়া সম্ভব (নবী-রাসুলদের কথা ভিন্ন, সাহাবায়ে কেরামও মাহফুজ ছিলেন)। তাই সাদ সাহেবের নেতৃত্বে কারণেই হোক কিংবা অন্য কোনো কারণেই হোক—তাবলীগের মাঝে অনেক কুসংস্কার, ভ্রান্তি, তাহরীফ ইত্যাদি প্রবেশ করেছে। এগুলোরও সংস্কার হওয়া দরকার।

৯. দীনের প্রতিটি কাজেই আলেমদের সরাসরি তত্বাবধান ও পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে ভুলের অনুপ্রবেশ অনেক সহজ। সুতরাং আলেমদের তত্বাবধানের প্রয়োজন তাবলীগওয়ালাদের কাছে আরও স্পষ্ট হয়েছে মনে হয়।

১০. বোম্বের মারকাযের একজন মুরুব্বিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তাবলীগের কাজে টাকা পয়সার প্রয়োজন পড়ে, মারকাযগুলো চালানোর প্রয়োজনও পড়ে। সেসব টাকা জনগণ দেয়। এগুলোর আয় ব্যয়ের হিসাব রাখা আবশ্যক কিনা? বললেন, আবশ্যক। তাহলে আপনারা রাখেন না কেন? উনি বললেন, আমাদের এখানে রাখা হয়। মাদরাসাগুলোর যেমন আয় ব্যয়ের হিসাব হয়, রসিদ হয়, অডিট হয়; মারকাযাগুলোও এমন হওয়া আবশ্যক। আয়েরও হিসাব থাকবে, ব্যয়েরও হিসাব থাকবে। সবকিছুই নিয়মতান্ত্রিক হবে।

১১. কোলকাতা, দিল্লি ও বোম্বের মারকাযগুলোতে দেখলাম ইমাম সাহেব মাইক দিয়ে নামায পড়াচ্ছেন, কেরাতও মাইকেই পড়ছেন। আমাদের মারকায ও ইজতেমাগুলোতেও মাইকের ব্যবহার করলে ভালো হয় না?

১২. সব কাজেই যোগ্য নেতেৃত্বের প্রয়োজন। সফল নেতৃত্ব ছাড়া সফলতা সম্ভব নয়। তাবলীগের পরবর্তী নেতৃত্বে কারা আসবে? কাদেরকে প্রস্তুত করা হচ্ছে? এমন প্রশ্নের কেউ সঠিক উত্তর দিতে পারেনি। নেতৃত্বের বিষয় না ভাবলে সাদের মতো গোমরাহ লোক নেতৃত্বে বসে যাবে; যাকে হটানো মুশকিল হয়ে পড়বে।

১৩. সাদ সাহেব আইন করেছিল, কোনো মারকাযে নতুন করে মাদরাসা বানানো যাবে না। এই আইনের উদ্দেশ্য এখন পরিষ্কার। তাই ভারতের মারকাযগুলোতে মাদরাসা নির্মিত হচ্ছে/হবে। বোম্বে মারকাযেও মাদরাসা আছে। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মারকাযে/মারকাযের সরাসরি তত্বাবধানে মাদরাসা প্রতিষ্ঠার হিম্মত দেখাতে পারেবন কি? নাকি আগের যুগেই থাকবেন? কত্ত বড় জাহালাত! এমন জাহালতি বুদ্ধি বের হয়েছে কোন শয়তানের মাথা থেকে, তাও আমরা বুঝতে পারিনি। তালীম ছাড়া তাবলীগের কী মূল্যায়ন আছে?!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here