জানাজার মাঠেই বার বার জ্ঞান হারালেন নুসরাতের খেলার সাথী

0
132

নুসরাতের খেলার সাথী- লাশবাহী গাড়ি ফেনীর সোনাগাজী পৌরসভার উত্তর চর চান্দিয়া গ্রামের একটি স্কুল মাঠে পৌঁছালে জড়ো হয় হাজারো মানুষ। এখানেই জানাজা হয়েছে নুসরাত জাহান রাফির।

জানাজায় অংশ নেওয়া বেশিরভাগ মানুষই জীবনে একবারের জন্যও দেখেননি নুসরতাকে। কিন্তু তাদের চোখও আজ পানিতে ভাসে। নীরবে কেঁদেছেন অনেকেই।

হাজারো মানুষের চোখের পানিতে এভাবেই শেষ বিদায় নিলো নিজ মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করা নুসরাত। তার বান্ধবীরা আজও পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসা কেন্দ্রে।

ওখানেই গত শনিবার পরীক্ষা দিতে গেলে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেওয়া হয়। এরপর টানা পাঁচ দিন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে গতকাল বুধবার রাতে শেষ নিশ্বাঃস ত্যাগ করেন নুসরাত।

আজ বৃহস্পতিবার সোনাগাজী সাবের পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বড় বোনের জানাজায় হাজির হয়েছিল ভাই রাশেদুল হাসান রায়হানও। ছোটবেলার খেলার সঙ্গীকে এত তাড়াতাড়ি হারাতে হবে তা মনে হয় কখনও ভাবতে পারেনি এই কিশোর।

বোনের শোকে বারবার জানাজার মাঠেই জ্ঞান হারাচ্ছিল সে। একই অবস্থা নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান, বাবা একেএম মুসা ও মা শিরিনা আক্তারেরও। ওই স্কুল মাঠে তারাও একাধিকবার অজ্ঞান হয়েছেন।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাদির কবরের পাশে সমাহিত করা হয় নুসরাতকে। জানাজায় ইমামতি করেন বাবা একেএম মূসা নিজেই।

এর আগে সকাল থেকে আত্মীয়-স্বজনসহ জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে দলে দলে মানুষ তাদের বাড়িতে ভিড় জমান। বিকেল ৫টায় সোনাগাজী পৌরসভার উত্তর চর চান্দিয়া গ্রামের বাড়িতে নুসরাতের লাশবাহী গাড়িটি পৌঁছালে হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

সেই অধ্যক্ষকে নিয়ে বোমা ফাটালেন নৈশ প্রহরী!

৬ এপ্রিল অগ্নিদগ্ধ ছাত্রী নুসরাতকে উদ্ধার করতে আসা দুজনের একজন হলেন মাদ্রাসার নৈশপ্রহরী মো. মোস্তফা। পুলিশের একজন সদস্যকে নিয়ে ওই মেয়েকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন মোস্তফা।

তিনি জানান, ‘অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা পরপর দুটি শ্লীলতাহানির ঘটনায় ধরা পড়েন। শুধু নুসরাত নয়, এর আগেও নিজ দপ্তরে একাধিকবার তাকে মেয়েদের সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় দেখেছি। এতে তিনি আমাকে চাকরিচ্যুত করার হুমকি দেন।

একবার তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, ‘পাথরের সঙ্গে কপাল ঠুকলে মাথা ফাটবে, নাকি পাথর ফাটবে?’ আমি বলেছিলাম মাথাই ফাটবে।’

এই নৈশপ্রহরী আরো বলেন, ‘অধ্যক্ষের দপ্তর ছিল নিচতলায়। মেয়েদের সঙ্গে অশালীন আচরণের ঘটনা একাধিকবার আমার চোখে পড়েছে। পরে তিনি নিচতলা সেফ মনে না করায় ‘সাপ ঢুকেছে, নিচতলার দপ্তর নিরাপদ নয়’ বলে পাশের ভবনের দ্বিতীয় তলায় তার অফিস স্থানান্তর করেন।’

দাদির কবরের পাশে চিরনিদ্রায় নুসরাত

মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির দাফন সম্পন্ন হয়েছে। আজ সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে ফেনীর সোনাগাজীতে নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাদির কবরের পাশে তার দাফন সম্পন্ন হয়।

এসময় উপস্থিত ছিলেন তার পরিবারের সদস্যরা, জেলা প্রশাসক ও পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা সহ তার বন্ধু বান্ধব ও প্রতিবেশীরা।

এসময় তার ভাই বলেন, আমার বোনের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। এসময় তিনি তার বোনের জন্য সকলের কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন।

গত ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মামলা করেন রাফির মা। এরপর সেই মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে তাকে মামলা তুলে নেয়ার জন্য চাপ দেয় তাতে রাফি রাজি না হওয়ায় অধ্যক্ষের পক্ষের লোকজন রাফির গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।

বোনের জন্য ক্ষমা চাইলেন নুসরাতের ভাই

লাখো মানুষ অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় দিয়েছেন ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসা কেন্দ্রে আগুনে পুড়ে নিহত আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে। নুসরাত জাহান রাফির জানাজায় বোনের জন্য ক্ষমা চাইলেন বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় সোনাগাজী সাবের পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে নুসরাতের মরদেহ দাফন করা হয়। জানাজায় ইমামতি করেছেন নুসরাতের বাবা মাওলানা একেএম মুসা।

চোখের পানিতে বুক ভিজিয়ে নুসরাতকে কবরে শায়িত করেন বাবা মাওলানা মুসা মানিক ও বড় ভাই নোমানসহ আত্মীয়-স্বজনরা। এ সময় কবরস্থান এলাকায় তৈরি হয় হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি। নুসরাতের বাবা ও ভাইয়ের চোখের পানিতে ভিজে যায় কবরের মাটি।

এর আগে সকাল থেকে আত্মীয়-স্বজনসহ জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে দলে দলে নারী-পুরুষ তাদের বাড়িতে ভিড় জমান। বিকেল ৫টায় সোনাগাজী পৌরসভার উত্তর চর চান্দিয়া গ্রামের বাড়িতে নুসরাতের মরদেহ পৌঁছালে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

নুসরাতের বাবা একেএম মুসা, মা শিরিনা আক্তার, বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান, ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান বার বার মূর্ছা যান। নুসরাতের মরদেহ একনজর দেখতে সকাল থেকে অপেক্ষা করা মানুষের চোখে ছিল পানি।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে নুসরাতের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে মানুষের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। পরে সেখানে উপস্থিত আত্মীয়-স্বজনসহ আগতদের মরদেহ না দেখিয়ে সোনাগাজী সাবের পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নিয়ে আসা হয়। সেখানে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে জানাজা-পূর্ব কার্যক্রম শুরু করেন সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন।

এ সময় বক্তব্য রাখেন ফেনী ইউনিভার্সিটি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম, জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুজজামান, পুলিশ সুপার এসএম জাহাঙ্গীর আলম সরকার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) পিকেএম এনামুল করিম, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আবদুর রহমান বিকম, সোনাগাজী উপজেলার চেয়ারম্যান জেড এম কামরুল আনাম, চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন মাহমুদ লিফটন, সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোহেল পারভেজ, নুসরাতের বাবা একেএম মুসা ও বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান।

এদিকে, নুসরাত জাহান রাফির জানাজায় বোনের জন্য ক্ষমা চাইলেন বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। জানাজা-পূর্ব বক্তব্যে কান্নাজড়িত কণ্ঠে দেশবাসীর কাছে দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন হাসান নোমান। তিনি বলেন, পাঁচদিন ধরে সারাদেশের মানুষ আমার বোনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসকরা বোনকে সুস্থ করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। দেশবাসীর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। তবে আমার বোনের হত্যাকারীদের বিচার চাই।

এর আগে বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নুসরাত জাহান রাফি। বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করেন চিকিৎসকরা। দুপুর ১২টায় মরদেহ নিয়ে রওনা হয়ে বিকেল ৫টায় বাড়িতে পৌঁছে নুসরাতের মরদেহ। ৬ এপ্রিল শনিবার সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসায় যান নুসরাত জাহান রাফি।

ওই সময় তার বান্ধবী নিশাতকে ছাদের উপর কেউ মারধর করেছে এক ছাত্রীর এমন সংবাদে ভবনের চারতলায় যান তিনি। সেখানে মুখোশ পরা চার-পাঁচ ছাত্রী তাকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেয়।

এতে অস্বীকৃতি জানালে তার গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায় তারা। এ ঘটনায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা ও পৌর কাউন্সিলর মুকছুদ আলমসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন নুসরাত জাহান রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here