কাশ্মীর নিয়ে লড়াই কেন?

0
93

পারমাণবিক শক্তিধর দুই বৈরী প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের সশস্ত্র সংঘাতের ইতিহাস দীর্ঘ। তুষারাবৃত পার্বত্য এলাকা কাশ্মীর তারা নিয়ন্ত্রণ করছে ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। এই এলাকাটি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যেকোনো সময় আবারও যুদ্ধ অনিবার্য।

গত বুধবার পাকিস্তান ও ভারতের যুদ্ধবিমানগুলো কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখায় আকাশযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এতে ভারত হারিয়েছে দুটি যুদ্ধবিমান। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন এক পাইলট। আর পাকিস্তান হারিয়েছে একটি যুদ্ধবিমান। এই আকাশযুদ্ধের আগের দিনই, মঙ্গলবার ভোররাতে পাকিস্তানের ভূখণ্ডে ঢুকে অভিযান চালায় ভারতীয় বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান। ভারত সরকারের দাবি, তারা পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গিসংগঠন জইশ-ই-মুহাম্মদের ঘাঁটিতে অভিযান চালিয়েছে। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি কাশ্মীরের পুলওয়ামায় ভারতের আধা সামরিক বাহিনীর গাড়িবহরে হামলা চালায় এই জঙ্গি সংগঠন।

১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। একটি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তান, অন্যটি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারত। (বাংলাদেশ প্রথমে পাকিস্তানের অংশ থাকলেও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এ দেশ স্বাধীনতা অর্জন করে।) হঠাৎ এই দেশভাগে বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে ভারত থেকে পাকিস্তানে, পাকিস্তান থেকে ভারতে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়। দাঙ্গায় নিহত হয় হাজারো মানুষ।

দেশভাগ হলেও হিমালয়ের পাদদেশের মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা জম্মু-কাশ্মীরের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কাশ্মীর তখন স্থানীয় এক রাজার শাসনাধীন। দেশভাগের পরপরই সেখানে সংঘাত শুরু হয়। ভারত ও পাকিস্তান সেনা পাঠায় সেখানে। পাকিস্তান কাশ্মীরের এক-তৃতীয়াংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়, আর ভারতের নিয়ন্ত্রণে যায় দুই-তৃতীয়াংশ। তবে কাশ্মীরের রাজা যে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন, তাতে এই অঞ্চল ভারতের অংশ হওয়ার কথা। পরে বিষয়টি মীমাংসার জন্য জাতিসংঘ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুপারিশ করে। সুপারিশে বলা হয়, জনগণের রায় যেদিকে যাবে, কাশ্মীর হবে সে দেশের অংশ। কিন্তু সেই নির্বাচন আর হয়নি। এদিকে ভারত ও পাকিস্তান নিজ নিজ নিয়ন্ত্রিত এলাকা পরিচালনা শুরু করে। কিন্তু উভয় দেশ কখনোই পুরো ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার প্রত্যাশা ছাড়েনি। ফলাফল, দুই দেশের বাহিনীর মধ্যে প্রায়ই নিয়ন্ত্রণরেখায় গোলা বিনিময় হয়।

এদিকে দুই দেশের সংঘাতের সুযোগে কাশ্মীরে মাথাচাড়া দেয় স্থানীয় সন্ত্রাসী ও জঙ্গিগোষ্ঠী। এসব গোষ্ঠীর অনেকগুলোই পাকিস্তানের মদদপুষ্ট। জঙ্গি সংগঠনগুলো কখনো কখনো ভারতের মধ্যে ঢুকেও হামলা চালিয়েছে। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হামলার ঘটনাটি হলো ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলা।

উত্তেজনা আরও বেড়ে গেল কেন?

সম্প্রতি ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার প্রধানতম কারণ পুলওয়ামায় ভারতের আধা সামরিক বাহিনীর গাড়িবহরে জঙ্গি হামলা। তবে উত্তেজনা বাড়ার পেছনে রাজনৈতিক কারণও রয়েছে। ভারতে লোকসভা নির্বাচনের আর খুব বেশি দিন বাকি নেই। আগামী মে মাসে এই নির্বাচন। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ওই জঙ্গি হামলার প্রতিশোধ নিতে উদ্‌গ্রীব।

এদিকে পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সদ্য ক্ষমতায় এসেছেন। গত বছরের নির্বাচনে দেশটির ক্ষমতাধর সেনাবাহিনীর সমর্থন পেয়েছেন তিনি। কাজেই ভারতের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়াতে তিনি যে প্রস্তুত, তা প্রদর্শন তাঁর জন্য জরুরি।

পরবর্তী সময়ে কী ঘটতে পারে?

কাশ্মীরের উরিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ঘাঁটিতে ২০১৬ সালে জঙ্গি হামলা হয়। এরপর ভারতীয় বাহিনী নিয়ন্ত্রণরেখা অতিক্রম করে জঙ্গি আস্তানায় ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ পরিচালনা করে। পাকিস্তান অবশ্য এ ধরনের কোনো অভিযানের কথা স্বীকার করেনি।

সাংবাদিক এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে বই রচয়িতা মাইরা ম্যাকডোনাল্ড বলেন, উরির হামলার পর চালানো অভিযানটি গুরুত্বপূর্ণ। ভারত সরকার সে সময় পশ্চিমা বিশ্বের সহানুভূতি পেয়েছিল। কিন্তু এবার ভারতের যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে, পাইলট আটক হয়েছেন। কাজেই পরিস্থিতি যেকোনো দিকে মোড় নিতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here